Padmayoni || পদ্মযোনি || Subhabrata Basu || Smell of Books Publication
- Saayan Sarkar
- Dec 28, 2025
- 4 min read

মেয়েটা আসলে কী চায়? টাকা? সে যে মন্দির থেকে চলে এসেছে এটা কি মন্দির কর্তৃপক্ষ জানে? এখন তিনি মেয়েটাকে নিয়ে মন্দিরে ফেরত যেতে পারেন, বস্তুত সেটা করাই বিধি।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন ‘তোমার নাম কী?’
‘চন্দ্রম্মাল’
‘দেখ, আমি মন্দিরের একজন ভক্ত, আমি…’
কথা শেষ হয় না তাঁর, চন্দ্রম্মাল নাতিউচ্চস্বরে বলে, ‘আপনি কে, কী করেন, মন্দিরে আপনার পরিচয় কী সব জেনেই এখানে এসেছি। আমি চাই না আমার মেয়ে আমার মতই একজন দেবদাসী হোক। আমার জীবন তো পালটে যাবে না। আমাকে দিনভোর মন্দির সাফাই করে, ফুল তুলে, মালা গেঁথে সন্ধ্যে বেলায় গান আর নাচ করে, আর রাতের অন্ধকারে পুরোহিত আর আর আপনাদের মত ভক্তদের বিছানায়…’
স্পষ্ট কথা বলছে মেয়েটি। কোনও উত্তেজনা নেই তার কন্ঠস্বরে, যা বলছে তার মানে জেনেই বলছে অথচ অস্বস্তি বোধ করছে বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু নারায়নস্বামী অস্বস্তি বোধ করছেন। তিনি গতবছরের শিবরাত্রির পুজোর কথা মনে করতে পারছেন। শত শত ভক্তের নামগানে মুখরিত মন্দিরে স্বয়ং সুন্দরেশ্বর শিবলিঙ্গ ফুলে মালায় ঢাকা পড়েছিল, ঘৃত-কর্পূরের সুবাসে ম’ ম’ করছিল মন্দিরের গর্ভগৃহ। তিনি পট্টবস্ত্র পরিহিত অবস্থায় চন্দ্রম্মালের অভিষেক পূজায় বসেছিলেন। সঙ্গে ছিল আরও তিনজন ভক্ত আর মন্দিরের প্রধান পুরোহিত চন্দ্রশেখরন। সেইদিন চন্দ্রম্মালসহ আরও চারজন দেবদাসীর অভিষেক হয়েছিল। চন্দ্রশেখরনের প্রধান পূজা আর আরতি শেষ হওয়ার পরে সাধারণ ভক্তদের মন্দির ছেড়ে চলে যাওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছিল, যেমন হয়ে থাকে। এরপর নৃত্য পরিবেশন করেছিল পাঁচজন দেবদাসী।
নারায়নস্বামী মনে করেন – মন্দিরে মন্দিরে এই দেবদাসীরা আছে বলেই এখনও ভারতবর্ষের ধ্রুপদী নৃত্যশিল্পের ক্রমবহমান ধারাটি বয়ে চলেছে। তিনি নিজে এই শিল্পের একজন গুনগ্রাহী। আহা, কী সেই দৃশ্য! পাঁচটি মেয়ে একযোগে কুচিপুড়ি নৃত্য পরিবেশন করেছিল। ফুলের গহনায় ঢাকা দেহে আর কোনও আবরণ বা আভরণ ছিল না। তাদের শরীরী হিল্লোলে মহাদেবের মনোরঞ্জন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্বলে উঠেছিল আগুন। পুরোহিত আর ভক্তদের দেহের কামনার আগুন। বিশেষ বিশেষ ভক্তদের জন্য মহাদেব সুন্দরেশ্বর তাঁর প্রসাদী নারীদেহগুলি বিতরণ করেছিলেন। নারায়ণস্বামী আইঙ্গার রাত কাটিয়েছিলেন চন্দ্রম্মালের সঙ্গে। দিনের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে তিনি দেখেছিলেন মন্দিরের তাঁর জন্য নির্দিষ্ট ঘরটির বিছানায় ছিন্নভিন্ন ফুলের মধ্যে শুয়ে রয়েছে একটি কিশোরীর নগ্ন রতিক্লান্ত দেহ। যাকে নারায়নস্বামী আইঙ্গার পৌরুষ দিয়ে বিদ্ধ করেছেন, যার রক্তাক্ত যোনিতে তিনি বপন করেছেন তাঁর বীজ। সুন্দরেশ্বর মহাদেবের প্রসাদ গ্রহন করেছেন অধ্যাপক।
সেই চন্দ্রম্মাল, আজ তার কলেজে এসে উপস্থিত। তাঁর সন্তানকে নিয়ে এসেছে। তিনি খেয়াল করলেন, মেয়েটি বলেছে ‘আপনার সন্তানকে নিয়ে এসেছি’। অর্থাৎ দেখুন শিবের প্রসাদ গ্রহণ করে আপনি দুনিয়ায় একটি নতুন প্রাণ পয়দা করেছেন। কিন্তু এর অর্থ কী? এর আগে তিনি যে অগণিত দেবদাসীদের সঙ্গে রাত্রিবাস করেছেন, তাদের মধ্যে কি কেউ গর্ভবতী হয়ে পড়েনি? মন্দির কর্তৃপক্ষ কি জানে না, কোন কোন দেবদাসীদের গর্ভে কার কার সন্তান উৎপাদিত হয়েছে? তারা কি সবাই সেই ভক্তদের কাছে ‘আপনার সন্তানকে নিয়ে এসেছি’ বলে উপস্থিত হয়েছে?
অবশ্য সবাই কিছু অধ্যাপক নারায়নস্বামী আইঙ্গারের মত চিরকুমার নন। তাঁদের অনেকের সঙ্গেই নারায়নস্বামীর ভালোই পরিচয় আছে। এক্ষেত্রে চন্দম্মালের দাবী কী?
তিনি একবার গলা খাঁকারি দিয়ে প্রশ্ন করলেন-‘তুমি আমার কাছে কী চাও?’
চন্দ্রম্মাল আবার তার শান্তস্বরে অনুচ্চকন্ঠে বলল –‘আমি চাই না আমার মেয়ে আমার মত দেবদাসী হোক, আপনি আপনার মেয়েকে আপনার মত বিদ্বান করে বড়ো করুন’
হঠাৎ বিষম খেয়ে যান অধ্যাপক। মেয়েটা বলে কী! দেবদাসীর মেয়ে, তাকে নিজের কাছে রেখে পড়াশোনা শেখাবেন তিনি? মেয়ে বড়ো হয়ে তাঁর মত অধাপক হবে? অথবা… একজন দেবদাসীর সন্তান!
‘শোনো চন্দ্রম্মাল, তুমি যদি চাও তোমাকে আমি কিছু সোনার গয়না গড়িয়ে দিতে পারি, চাও তো কাঞ্জিভরম সিল্কের শাড়ি কিনে দিতে পারি। কিন্তু তোমার সন্তান বিশেষ করে সে যখন কন্যাসন্তান, তাকে পড়াশোনা করানোর ক্ষমতা আমার নেই’।
চোখদুটো জ্বলে ওঠে চন্দ্রম্মালের, ‘তার মানে আপনি চান, আপনার মেয়ে বড়ো হয়ে একজন দেবদাসী হোক তাই তো?’
‘সেটাই তো স্বাভাবিক, তাই না?’
‘কোনটা স্বাভাবিক? দেবদাসীর মেয়ের দেবদাসী হওয়ার জন্য বড়ো হয়ে ওঠা? মন্দিরের কোনও অনুষ্ঠানে তাকে দেবদাসী হিসেবে দেবতার ভোগে লাগানো? তারপর আবার কোনও শুভদিন দেখে তাকে মন্দিরের দেবদাসী হিসেবে অভিষেক পুজোয় নাচতে বলা? তারপর আবার কোনও বিশেষ ভক্তের বিছানায় রাত্রিযাপন করা, যাতে আবার একজন দেবদাসীর জন্ম দিতে পারে আপনার সন্তান?’
নারায়নস্বামী নিরুত্তর হয়ে থাকেন কিছুকাল। তারপর বলেন – ‘তুমি আমার সঙ্গে মন্দিরে ফিরে চল চন্দ্রম্মাল, আমি তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসছি। আমার পক্ষে মন্দিরের সঙ্গে, মহাদেব সুন্দরেশ্বরের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা সম্ভব নয়’।
‘আপনি হয়ত চিন্তা করেছেন, আমি কী করে আপনার পরিচয় জানলাম? কী করে জানলাম আপনি একজন কলেজের অধ্যাপক? কী করে জানলাম আপনাকে এখানে পাওয়া যাবে?’
নারায়নস্বামী চুপ করে বসে থাকেন, উত্তর দিতে পারেন না। সত্যিই তিনি এই প্রশ্নের উত্তরগুলোই জানতে চাইছিলেন।
চন্দ্রম্মাল বলতে থাকে –‘আপনি জানেন, আমিও একজন দেবদাসীর মেয়ে। আমার মা ঐ সুন্দরেশ্বর মহাদেবের একজন দেবদাসী। আমরা আমাদের মায়ের নাম জানতে পারি, কিন্তু বাবার নাম জানতে পারি না। আমাদের জানতে দেওয়া হয় না। কিন্তু আমার মা, ভেদুয়াম্মাল যিনি ঐ মন্দিরের একজন দেবদাসী – তিনিই আমাকে জানিয়েছেন আমার বাবা কে! আমার কন্যাসন্তানের জন্মের পর একদিন আমাকে আবার মন্দিরে নৃত্য পরিবেশন করতে বলা হয়। নৃত্যপরিবেশন শেষে আমাকে বলা হয় চন্দ্রশেখরন মহাশয়ের ঘরে রাত কাটাতে হবে। আমার মা খুব শান্ত নরম প্রকৃতির মানুষ, জানেন। কিন্তু সেদিন মা হঠাৎ প্রচণ্ড রেগে ওঠে। আমাকে নিয়ে সরাসরি চন্দ্রশেখরনের ঘরে যায়। এবং সেখানে গিয়ে মা রাগে ফেটে পড়ে, বলে – মন্দিরে ভগবানের নামে যা চলছে তাকে এককথায় একটা ঘৃণিত ব্যবস্থা বলা চলে। অন্তত ধর্মের দোহাই দিয়ে এই ব্যবস্থা চলতে পারে না। চন্দ্রশেখরন সেদিন সুস্থ মস্তিষ্কে ছিলেন না, নেশা করেছিলেন। মায়ের চিৎকারে সম্ভবত তাঁর নেশায় ব্যাঘাত ঘটে থাকবে, ফলে তিনি মা’কে কষিয়ে একটা চড় মারেন। তারপরেও মা’কে থামানো যায়নি। মা সেদিন চিৎকার করে চন্দ্রশেখরনকে বলেন – আজ যাকে নিয়ে আপনি রাত্রিবাস করতে চাইছেন সেই চন্দ্রম্মাল আসলে আপনার ঔরসে জন্মগ্রহণ করা কন্যাসন্তান। এরপরেও চন্দ্রশেখরনকে আটকানো যায়নি। আসলে, মন্দিরে দেবদাসীদের পরিচয় একমাত্র দেবতার সেবাদাসী, দেবতাদের প্রসাদী নারী। সেখানে পিতৃপরিচয়ের কোনও মূল্য নেই। ফলে সেদিন রাত্রে আমাকে চন্দ্রশেখরনের ঘরেই রাত কাটাতে হয়, যিনি আসলে আমার পিতা!
আমি চাই না। আমার মেয়ের ভাগ্যেও এমন দূর্দশা দেখা দিক। আপনি যদি ওকে মেয়ের মর্যাদা না দেন, তাহলে দেবদাসী হওয়াই ওর ভবিতব্য। হয়ত, ওকেও বড়ো হয়ে একদিন আপনার বিছানায় রাত কাটাতে হবে, সকালে দেখবেন নিষ্পেষিত ফুলের মাঝে রক্তাক্ত যোনি নিয়ে শুয়ে আছে আপনারই কন্যা, আপনারই বুনে দেওয়া বীজ গর্ভে নিয়ে!
পদ্মযোনি
শুভব্রত বসু
স্মেল অফ বুকস
৩৯৯ টাকা
Smell of Books Publication
Subhabrata Basu




Comments